আপনার শিশুর জন্যে মেনিনগোকক্কাল টিকাকরণ এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন?

Image: Shutterstock

যখন আমার সন্তানের বয়স ছিল ১০ মাস, হঠাৎ এক সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখা যায় যে তার খুব জ্বর এসেছে। আপাত দৃষ্টিতে দেখতে গেলে সেটি সাধারণ সর্দি জ্বরের মতই লাগছিল, কিন্তু আমার শিশু ওইটুকু জ্বরেই খুব অস্থিরতায় ভুগছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাই আর সেখানে বসে থাকতে থাকতেই একটি ছোট প্যাম্পলেট দেখতে পাই যাতে মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস ও তার নানারকমের লক্ষণ সম্পর্কে লেখা ছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি যে এই সব কটি লক্ষণ আমার শিশুর সাথে মিলে যাচ্ছে, কিন্তু আমি ওকে কোনোদিনও মিনিনগোকক্কাল টিকাকরণ প্রদান করিনি। পরে যদিও আমার ডাক্তার নিশ্চিত করেন যে ওর সাধারণ সর্দি জ্বর ছাড়া কিছুই হয়নি, তাও, ওই তথ্যটি পড়ার পর আমি কিছুদিন পরেই ওকে মেনিনগোকক্কাল টিকাকরণ দেওয়াতে নিয়ে যাই।

আজও আমার সেই দিনটির কথা মনে পড়ে যে আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম যখন আমি আমার শিশুর মেনিনজাইটিস হওয়ার সন্দেহ করেছিলাম। আর একজন মা হিসেবে তাই আমি আমার সমস্ত চিন্তা ভাবনা আপনাদের সাথে ভাগ করতে চাই যাতে আপনিও আপনার সন্তানের সুরক্ষার জন্যে প্রতিটি ব্যবস্থা নিতে পারেন ও কখনও কোনো বিষয় দেরি হা হয়ে যায়।

মেনিনগোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাক্সিন (এমসিভি) হল এমন একটি টিকাকরণ যা মেনিজাইটিস ঘটানো ৩ টি ব্যাক্টিরিয়া র মধ্যে সব থেকে গুরুতর ব্যাক্টিরিয়া তির বিরুধ্যে লড়াই করে। মেনিনগোকোক্কাল মেনিনজাইটিস এততাই মারাত্মক একটি রোগ যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারুর জীবন পর্যন্ত নিয়ে নিতে পারে। এমনকি, সেরে গেলেও এই রোগের প্রভাব দীর্ঘ বছর ধরে মানুষের জিবনে জটিলতা ও সমস্যার সৃষ্টি করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রুগী পঙ্গুও হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশের জাতীয় টিকাকরণ তালিকায় এখনও পর্যন্ত এমসিভি বাধ্যতামুলক টিকাকরণ হিসেবে গণ্য হয়নি, কিন্তু সন্তানের সুরক্ষার জন্যে আপনার অবশ্যই এই ব্যাপারে চিন্তিত হওয়া প্রয়োজন।

মেনিনজাইটিস কি?

মানুষের মস্তিস্ক ও শিরদাঁড়ার বাইরে যেই সুরক্ষা প্রদানকারী আভরন থাকে সেগুলি যখন হঠাৎ ফুলে যেতে শুরু করে তখন তাকে বলা হয় মেনিনজাইটিস। এই ফুলে যাওয়ার কারন হল মস্তিস্ক ও শিরদাঁড়ার বাইরের আভরনে ভাইরাস অথবা ব্যাক্টিরিয়ার সঙ্ক্রমণ যা ফলস্বরুপ ফুলে যেতে শুরু করে। যদিও বিভিন্ন রকমের ড্রাগ অথবা শরিরে কোন আঘাত লাগার ফলে, বা ক্যান্সারের ফলেও মেনিনজাইটিস হতে পারে।

মেনিনজাইটিসের প্রকারঃ

মেনিনজাইটিসের সংক্রমণ নীচের কয়েকটি প্রকারের হয়ে থাকে।

  • ব্যাক্টিরিয়া ল মেনিনজাইটিস- এটি হল এমন একটি দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়া রোগ যা মস্তিস্কের বাইরের আভরনে ফুলে যাওয়ার ফলে হয়। নিসেরিয়া মেনিঙ্গিটাইডিস, স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়া ও হিমোফিলিয়া ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি নামক একটি ব্যাক্টিরিয়াগুলি হল ব্যাক্টিরিয়াল মেনিনজাইটিসের প্রধান কারন। এর জন্যে অনেক রকমের টিকাকরণ রয়েছে।
  • ভাইরাল মেনজাইটিস ব্যাক্টিরিয়াল মেনিনজাইটিসের তুলনায় কম ভয়ঙ্কর এবং এতে সুস্থ হয়ে ওঠার প্রবণতা বেশি। এই মেনিনজাইটিসের মূল কারণ হল এন্টেরোভাইরাস ও মাম্পস ভাইরাস। এর জন্যে এখনও অবধি কোনো টিকাকরণ উপলব্ধ নয়।

মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিসের লক্ষণগুলি কি?

মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস ৫ জনের মধ্যে ১ জনের হয়েই থাকে এবং এর জটিলতা প্রচুর। এর ফলে কানে শোনার সমস্যা, মস্তিষ্কের সমস্যা, স্নায়ুর সমস্যা ইত্যাদি দেখা দেয়। মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলি অনেকটা সাধারণ সর্দি জ্বরের মত হয়ে থাকে। তবে বয়সের সাথে সাথে সংক্রমণের প্রভাব অনুযায়ী লক্ষণগুলিও পাল্টাতে থাকে। প্রাথমিক লক্ষণগুলি হল:

  • অসুস্থ বোধ করা।
  • মাথা যন্ত্রণা।
  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
  • বমি ভাব।
  • উজ্জ্বল আলো সহ্য করতে না পাওয়া।
  • সারাক্ষন ঘুম ঘুম ভাব।
  • গা হাত পা ও জয়েন্টে ব্যাথা।
  • মানসিকভাবে ক্লান্ত বোধ করা।

কাদের মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস হওয়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে?

এই রোগ বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায় কারণ এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সংক্রমণের বিরুধ্যে লড়াই করার ক্ষমতা খুব কম থাকে। তার ওপর বাচ্চাদের কষ্ট প্রকাশ করার ক্ষমতাও থাকেনা। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

একটি শিশুর জন্যে মেনিনগোকক্কাল টিকাকরণ নেওয়ার যোগ্য বয়স কত?

যেকোনো বয়সে এই টিকাকরণ নেওয়া যেতে পারে। তবে সঠিক পরামর্শের জন্যে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে ভুলবেন না।

মেনিনগোকক্কাল টিকাকরণের পার্শপ্রতিক্রিয়াগুলি কি?

মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিসের কয়েকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। তাই এটি নেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে ভালো করে পরামর্শ করে নেবেন।

  • জ্বর, মাথা যন্ত্রনা, বমিভাব ও পেট খারাপ।
  • টিকাকরণ নেওয়ার অংশটিতে লালচেয়ে ভাব, ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
আমার শিশু যথেষ্ট পুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে থাকে, তাও কি ওর মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস হতে পারে?

পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ার সাথে মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরো তৈরী হতে বেশ খানিকটা সময় লাগে এবং তাদের ব্যাকটিরিয়া ও ভাইরাল ইনফেকশন বড়দের তুলনায় বেশি তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া বাচ্চারা যেহেতু স্কুল, পার্ক, সংগঠন, ইত্যাদির সাথে বেশি যুক্ত থাকে, তার ফলে এরা পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে অত বেশি জ্ঞান রাখেনা। এছাড়া তাদের মধ্যে জল ও খাবার ভাগ করে খাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে।

ছোঁয়াচে হওয়ার ফলে হাঁচি ও সর্দির মাধ্যমে মেনিনজাইটিস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই এক্ষেত্রে টিকাকরণ নিয়ে রাখা খুব প্রয়োজনীয়।

মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিস এতখানি মারাত্মক হওয়ার সত্বেও এর টিকাকরণ জাতীয় টিকাকরণ প্রকল্পে বাধ্যতামূলক নয় কেন?

যেহেতু মেনিনজাইটিস একটি বিরল অসুখ, তাই জাতীয় টিকাকরণ প্রকল্পে এটি এখনও পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটি কখনোই হতে পারেনা। ২০১৭ সালে মোট ৩২৫১ জনের মেনিনজাইটিস হওয়ার খবর পাওয়া যায় যার মধ্যে ২০৫ জনের মৃত্যু হয়। তাই মেনিনগোকক্কাল টিকাকরণ নেওয়া খুব জরুরি। তাছাড়া অভিভাবক হিসেবে আপনি নিশ্চই আপনার শিশুর জন্যে সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রদান করার চেষ্টা করবেন।

দাবি: এই তথ্যগুলি জনস্বার্থে প্রচারিত সানোফি পাস্তিওরের দ্বারা নিজস্ব মতামত হিসেবে প্রকাশিত করা হল। শিশু ও বড়োদের স্বাস্থ সচেতনতার জন্যে এই তথ্যগুলি বিশেষ করে প্রদান করা হল।

Author: Chaitra

Was this information helpful?