গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা  | Thyroid Problem During Pregnancy In Bengali

Image: Shutterstock

IN THIS ARTICLE

বর্তমানে পৃথিবীতে থাইরয়েডের সমস্যায় বহু মানুষ আক্রান্ত । আর গর্ভাবস্থায় অনেকেই এর জন্য নানা সমস্যায় পড়েন। আমাদের এই প্রতিবেদনে আপনাদের জন্য প্রেগন্যান্ট অবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ঠিক কি কি হতে পারে, তার সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া হল।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের গুরুত্ব

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের মাত্রা বৃদ্ধির পিছনে মূলত দুটি হরমোন -ইস্ট্রোজেন এবং হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন(HCG) দায়ী। যখন আপনি গর্ভবতী হন, তখন থেকেই  এই থাইরয়েড হরমোনগুলি আপনার স্বাস্থ্য এবং আপনার বাচ্চার মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ-উভয় ক্ষেত্রেই মূখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। এই HCG, TSH( থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন) এর মতোএবং আরও কিছু হরমোন সৃষ্টি করার জন্য থাইরয়েড গ্রন্থিকে উদ্দীপ্ত করে। ফলে শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেড়ে যায় ও তা থাইরয়েড বাইন্ডিং গ্লোবিউলিন উৎপন্ন করে, যেটি রক্তের মধ্যে থাইরয়েড হরমোনের গমনে সহায়তাকারী একটি প্রোটিন। প্রথম ট্রাইমেস্টারে, আপনার গর্ভস্থ শিশু থাইরয়েড হরমোনের চাহিদার কারণে সে আপনার উপর নির্ভর করে। আর এটি চলতে থাকে 12 সপ্তাহ না হওয়া পর্যন্ত, যার পর থেকে শিশুর থাইরয়েড গ্রন্থিটি নিজে থেকে কাজ করতে শুরু করে। আর মূলত এই কারণেই প্রেগন্যান্ট অবস্থায় থাইরয়েডের মাত্রা বেড়ে যায় শরীরে (1)

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা কি স্বাভাবিক ?

প্রায় বেশিরভাগ মহিলাই গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যায় পড়েন। আর কেন তা হয়ে থাকে তা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ সম্পর্কে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা হওয়ার কারণগুলি কি কি ?

হাইপারথাইরয়েডিজমের (Hyperthyroidism) ক্ষেত্রে

হাইপারথাইরয়েডিজম সাধারণত একটি স্ব-প্রতিরোধী অনাক্রম্য তন্ত্রের বিশৃঙ্খলাজনিত ব্যাধি হিসেবে ধরা হয়। যার ফলে অনাক্রম্য তন্ত্রটি কোষ এবং অঙ্গাণুগুলিকে রক্ষা করার বদলে তাদের আক্রমণ করতে থাকে (2) । অ্যাডিনোমাস কলার বিষক্রিয়ার ফলে থাইরয়েড গ্রন্থিতে যে কলাগুলি উৎপন্ন হয়,তা থেকে ক্ষরিত হরমোনগুলি শরীরে রাসায়নিক সমতা নষ্ট করে দেয়।

হাইপোথাইরয়ডিজমের (Hypothyroidism) ক্ষেত্রে

থাইরয়েড গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করতে শুরু করে , তাহলে আপনি হাইপোথাইরয়ডিজমের শিকার হয়েছেন। এর কারণগুলি হল থাইরয়েডের অপসারণ, এন্ডেমিক গাইটার, আয়োডিনের অভাব এবং পিটুইটারি গ্রন্থি সম্পর্কিত রোগ (3)। আর যাদের আগে থেকেই হাইপোথাইরয়ডিজমের সমস্যা ছিল, তাদের ক্ষেত্রে এটি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের উপসর্গ

হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism)

এক্ষেত্রে নিচে উপসর্গগুলি উল্লেখ করা হল  (2)

  • অতিরিক্ত ঘাম
  • বদহজম
  • টেনশন করা
  • অস্থিরতা
  • পালস রেট বেড়ে যাওয়া
  • ওজন কমে যাওয়া
  • অনিদ্রা
  • চুল পড়া
  • খিদে না পাওয়া ইত্যাদি।

হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism)

এক্ষেত্রে নিচে উপসর্গগুলি উল্লেখ করা হল (3)

  • ক্লান্তি কিংবা অবসাদ
  • অমনোযোগিতা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ঠান্ডা ভাব অনুভব করা
  • গাঁটে গাঁটে ব্যাথা
  • শুষ্ক ত্বক
  • ত্বকের টান অনুভব করা ইত্যাদি।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের প্রভাব

হাইপারথাইরয়েডিজমের (Hyperthyroidism) ও হাইপোথাইরয়ডিজমের (Hypothyroidism) ক্ষেত্রে যেসব প্রভাব পড়তে পারে তা নিচে উল্লেখ করা হল (1)

  • কনসিভ করতে সমস্যা হতে পারে ।
  • হাইপারথাইরয়েডিজমের সঠিক চিকিৎসা না হলে বা গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক না থাকলে, হঠাৎ করে গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • হাইপোথাইরয়ডিজমের কারণে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধা পায়
  • শিশু কম IQ লেভেল কম হতে পারে।
  • থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিক হলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে ডেলিভারি হতে পারে বা মৃত সন্তানও জন্ম নিতে পারে।
  • বাচ্চা গর্ভে সঠিকভাবে বাড়তে পারে না।
  • ভবিষ্যতে ওই বাচ্চাটির থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড নির্ণয়

উপরে উল্লেখিত উপসর্গগুলি দেখা দিলে যেসব পরীক্ষা দ্বারা থাইরয়েড নির্ণয় করা হয়, তা নিচে উল্লেখ করা হল (4)

  • TSH পরীক্ষা

TSH পরীক্ষাটি হল থাইরয়েড ক্রিয়া পরিমাপের জন্য পরিচালিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগুলির মধ্যে একটি অন্যতম পরীক্ষা।

  • T3 এবং T4 পরীক্ষা

TSH পরীক্ষাটিতে যদি মাত্রাগুলি খুব কম দেখায় তাহলে সেক্ষেত্রে T3 এবং T4 পরীক্ষাগুলি করতে বলা হয় । যদি মুক্ত T4(থাইরয়েড হরমোনের এই অংশটি থাইরয়েড বাইন্ডিং প্রোটিনের সাথে যুক্ত থাকে না) এর মাত্রা উচ্চ থাকে ,সেক্ষেত্রে এই রোগটি নির্ণয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায়।

  • TSI পরীক্ষা

যেসব মহিলার রেডিওঅ্যাক্টিভ বা তেজস্ক্রিয় চিকিৎসা হয়েছে , তাদের ক্ষেত্রে এটি করা হয় ।এই পরীক্ষাটি গর্ভবতী মহিলার দেহে TSI অ্যান্টিবডি উপস্থিত আছে নাকি পরিমাপ করে।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের চিকিৎসা

হাইপারথাইরয়েডিজমের (Hyperthyroidism) ক্ষেত্রে

গুরুতর থাইরয়েড ব্যাধির ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টারে ডাক্তাররা অনেকসময় প্রেসক্রিপশনে কম মাত্রায় প্রপিলিথিউরাসিল(PTU) লেখেন। এরপর প্রয়োজন হলে পড়লে প্রথম ট্রাইমেস্টারের পরে অ্যান্টি-থাইরয়েড ওষুধ দিয়ে থাকেন (5)। খুব কম ক্ষেত্রে এমন হয় যে রোগীর যদি ওষুধে কোনও কাজ না করে, তাহলে থাইরয়েডের একটা অংশ বাদ দেওয়ার জন্য অস্ত্রপ্রচার করা হয়ে থাকে ।

হাইপোথাইরয়ডিজমের (Hypothyroidism) ক্ষেত্রে

মূলত প্রেগন্যান্সির সময় হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা করা হয় একটি সিন্থেটিক থাইরয়েড হরমোন থাইরক্সিন নামক ওষুধের দ্বারা (3) । বলা যেতে পারে থাইরক্সিন মা এবং সন্তানের জন্য উপকারি এবং নিরাপদও বটে। যে সকল মহিলার মধ্যে গর্ভবস্থার আগেই  হাইপোথাইরয়েডিজমের শিকার হন ,তাদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে কথা বলার পর ডোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

গর্ভাবস্থায় কীভাবে থাইরয়েড এড়াবেন ?

প্রেগন্যান্ট অবস্থায় থাইরয়েডের সমস্যা এড়ানোর জন্য কিছু উপায় নিচে উল্লেখ করা হল।

  • ভারী ধরণের ডায়েট থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন যা দীর্ঘ সময়ের জন্য খিদের ইচ্ছে প্রকাশ করতে দেয় না ।
  • থাইরয়েড গ্রন্থি এক্স-রে তে সংবেদনশীল তাই গর্ভাবস্থায় যখনই রশ্মি সংক্রান্ত পরীক্ষা করা হবে , তার আগেই সেটি পরীক্ষককে জানিয়ে দেবেন।
  • আপনি যদি গর্ভবতী হয়ে থাকেন এবং ধূমপানের অভ্যাস থাকে,তবে সেটি বন্ধ করা প্রয়োজন । এটি থাইরয়েডের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে ।
  • গর্ভাবস্থার উপর থাইরয়েডের প্রভাব কম করার জন্য হাইপোথাইরয়েডের সীমান্তে থাকা মহিলাদের গর্ভাবস্থার শুরুতেই কম মাত্রায় থাইরয়েড হরমোনের ডোজ শুরু করে উচিত ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড সমস্যার ক্ষেত্রে  ডায়েট

হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য

মা এবং সন্তানের স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য গর্ভাবস্থায় দেহে উচ্চ মাত্রায় পুষ্টির চাহিদা হয়ে থাকে। এই সময়ে হবু মাকে একটি সুষম আহার যেমন ফল, শাক সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।  প্রসবের পরে ভিটামিন এবং আয়োডিন যুক্ত খাবার খাওয়ার কথা বলা হয়ে থাকে (6)

হাইপোথাইরয়েডিজমের জন্য

হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলাদের প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে ডাক্তারের প্রস্তাবিত আয়োডিনের ডোজ খাওয়া উচিত এবং সাধারণ লবণের জায়গায় আয়োডিনযুক্ত লবণ খাওয়া উচিত । সবুজ শাক-সবজি যেমন পালং শাক, মেথি শাক এবং লেটুস পাতার মতো শাকগুলি খেলে তা শরীরে ম্যাগনেসিয়াম সরবরাহ করে যা থাইরয়েড গ্রন্থির ক্রিয়ার জন্য উপযোগী । মরশুমের সব ধরণের ফল খাবেন । ডিম, আখরোট, মাশরুম ও ছোটো মাছকে  আপনার ডায়েটের মধ্যে রাখুন।

কীভাবে থাইরয়েডের সমস্যা থাকা সত্বেও গর্ভবতী হওয়া যায় ?

গর্ভধারণ করার পর থেকে মায়ের শরীরে যে সব হরমোন তৈরী হয় তা শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে থাইরয়েড হল অন্যতম। গর্ভধারণের প্রথম দিকে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর চাহিদা মেটাতে বেশি থাইরয়েড হরমোন প্রয়োজন এবং গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এই হরমোনের চাহিদা প্রায় 50% বেড়ে যায় এবং তা থাইরয়েডের ঘাটতিজনিত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই থাইরয়েড হরমোনের কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখতে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে।

তাই গর্ভধারণ করার আগেই থাইরয়েড টেস্ট অবশ্য়ই করাতে হবে। আর আগে থেকে থাইরয়েডের সমস্য়া আছে জানা থাকলে নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে । আসলে থাইরয়েডজনিত সমস্য়াগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেই গর্ভধারণ করতে সেরকম অসুবিধা হয় না।

তা হলে আশা করি বুঝতেই পারছেন, থাইরয়েডের সমস্য়াকে কিভাবে পরিচালনা করবেন এক্ষেত্রে। এর জন্য প্রয়োজন একটু সচেতনতা । তাই গর্ভাবস্থায় যদি এই সমস্যার মুখে পড়েন , ভয় পাবেন না, যথা সময়ে ডাক্তারের সঙ্গে পরিচয় করুন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন।

References :