প্রেগন্যান্সি রোধ বা জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপায়  | How To Avoid Pregnancy In Bengali

Image: Shutterstock

IN THIS ARTICLE

অসময়ে প্রেগন্যান্সি রোধের নানা উপায় আছে, কিন্তু অনেকেই তা সঠিক ভাবে জানেন না বা প্রয়োগ করতে পারেন না । তাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমাদের এই প্রতিবেদনে  প্রেগন্যান্সি রোধের নানা উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে।

এক্ষেত্রে পুরুষদের এক বিরাট ভূমিকা থাকে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে ঠিক কি করা উচিত ?

  • কন্ডোমের ব্যবহার 

এটি সবচেয়ে সাধারণ গর্ভনিরোধক যা কোনও ওষুধের দোকানে সহজেই পাওয়া যায়। এটি লিঙ্গের উপরে পরিয়ে দিতে হয় এবং এটি শুক্রাণুকে মহিলার দেহে প্রবেশ করতে দেয় না তবে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় (1) । তাই যৌন মিলনের সময় একটি কন্ডোমে ব্যবহার করা উচিত। এটি একবার ব্যবহার করা হয়ে গেলে পুনরায় ব্যবহার করা যায় না। এর দাম সাধ্যের মধ্যে । পুরুষ কন্ডোমের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহার হয় ল্যাটেক্স কন্ডোম। অন্যান্য বিকল্পের মধ্যে রয়েছে সিলিকন রাবার এবং পলিউরেথেন কন্ডোম। তেল জাতীয় কোনও পণ্য (ভ্যাসলিন, লোশন, ম্যাসেজ অয়েল বা ময়শ্চারাইজার) কনডমের সাথে ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এতে এটি ছিঁড়ে যেতে পারে। পরিবর্তে, আপনি যে কোনও জল-ভিত্তিক লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করতে পারেন। আপনিও একটি লুব্রিক্যান্ট হিসাবে স্পার্মাইসাইড জেলি ব্যবহার করতে পারেন।

মহিলাদের ক্ষেত্রে ঠিক কি করা উচিত ?

  • স্পার্মাইসাইড

স্পার্মাইসাইডগুলিতে রাসায়নিক এজেন্ট থাকে  যা শুক্রাণুকে মেরে ফেলতে পারে। এগুলি জেল, ক্রিম, ট্যাবলেট, স্পঞ্জ  বিভিন্ন রূপে উপলব্ধ। যৌন মিলনের এক ঘন্টা আগে এটিকে যোনিতে দিয়ে রাখতে হবে এবং সহবাসের পরে প্রায় ছয় থেকে আট ঘন্টা পর পর্যন্ত রেখে দেওয়া উচিত। এটি অন্যান্য গর্ভনিরোধক যেমন সার্ভিকাল ক্যাপ বা ডায়াফ্রামের সাথেও ব্যবহৃত হয়। এই জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিটি ব্যবহার করার আগে ডাক্তারের সাথে অবশ্যই পরামর্শ করে নেবেন । এটি ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়।

  • ফিমেল কন্ডোম

এটি একটি লুব্রিকেটেড, নরম, পলিউরেথন জাতীয় যা শুক্রাণুকে মহিলারদের দেহে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। এটি জন্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ঠিক যেমন কোনও পুরুষ কন্ডোম

কাজ করে, সে ভাবেই কাজ করে । এটি 95% কার্যকর যখন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়।

একটি মহিলা কনডম একটি লুব্রিক্যান্ট দিয়ে প্যাক করা হয় এবং বেশিরভাগ ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়। এটি সার্ভিক্সকে ঢাকা দিয়ে যোনির মধ্যে পড়তে হয়। একটি কন্ডোম

কেবল একবার ব্যবহার করা উচিত।

  • সার্ভিক্যাল ক্যাপ

এটি নরম, পাতলা সিলিকন দিয়ে তৈরী ত্রিকোণাকৃতি কাপ (2)। এটি জরায়ুতে শুক্রাণুকে প্রবেশ করতে দেয় না নিষেকের জন্য। এটি প্রায় 92 থেকে 96% কার্যকর যখন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি বিভিন্ন আকারে উপলব্ধ এবং যখন আপনি যৌন মিলনে আবদ্ধ হবেন তখন ব্যবহার করা উচিত এবং সহবাসের ছয় বা তার থেকে বেশি সময় রাখতে হয়।  তবে তিরিশ ঘন্টার বেশি রেখে দেবেন না।

  • সার্জিকাল স্টেরিলাইজেসশন 

এটি স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণের পরিমাপ, যার ফলে ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকে না। পদ্ধতিটি একজন ডাক্তার দ্বারা সম্পাদিত হয়। তাই এটির জন্য একজন ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন।এই পদ্ধতি (ভ্যাসেকটমি এবং টিউবাল লিগেশন) অত্যন্ত কার্যকর এবং স্থায়ী।

  • ইন্ট্রাইউট্রিন ডিভাইস 

এটি একটি ছোট, টি-আকৃতির তামার সরঞ্জাম যা জরায়ুতে স্থাপন করা হয় । পদ্ধতিটি একজন ডাক্তার দ্বারা সম্পাদিত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী গর্ভনিরোধ পদ্ধতি হিসাবে কাজ করে (2)

এটি সর্বোচ্চ 10 বছর পর্যন্ত রাখা যেতে পারে, তারপরে এটি পরিবর্তন করা উচিত।

এটি শুক্রাণু ডিম্বাণুর মিলনে বাধা দেয় এবং জরায়ুর আস্তরণের পরিবর্তন করে যাতে নিষিক্ত ডিমগুলি নিজেকে সংযুক্ত না করে নিষেকে।  এটি  করার পর  কোনও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হলে অবশ্যই ডাক্তারকে জানান।

গর্ভাবস্থা এড়ানোর জন্য ঘরোয়া উপায়

  • ক্যালেন্ডার রিতিম মেথড 

এই পদ্ধতিটি আপনার গত ছয় থেকে 12 মাসের ঋতুচক্রের রেকর্ড থেকে সর্বাধিক ফার্টাইল সময়ের অনুমানের উপর ভিত্তিতে করা হয়। ডাব্লুএইচও (WHO)-র মতে, আপনি যদি আপনার সবচেয়ে দীর্ঘ চক্রের দৈর্ঘ্য থেকে 18 দিন এবং আপনার দীর্ঘতম চক্রের দৈর্ঘ্য থেকে 11 দিন বাদ দেন তবে আপনার ফার্টাইল সময়ের অনুমান করে নিতে পারবেন (3)। তাই এই সময়ের মধ্যে অনিরাপদ সহবাস এড়াতে চেষ্টা করা উচিত।

  • বেসাল বডি টেম্পারেটার মেথড 

এই পদ্ধতিটি ডিম তৈরী হওয়ার পরে যে তাপমাত্রার সৃষ্টি হয় তা প্রজেস্টেরনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে পরিবর্তিত তাপমাত্রার পরিবর্তনের ভিত্তিতে তৈরি হয়। সাধারণত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হওয়ার পরে তৃতীয় দিন থেকে বন্ধ্যাত্বকাল শুরু হয়। তাপমাত্রা পরিমাপ করার সময়, এটি প্রতিদিন একই সময়ে রেকর্ড করুন। ডাব্লুএইচওর(WHO) পরামর্শ দেয় যে দম্পতিরা এই পদ্ধতিটি অনুশীলন করেন তাদের শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির তৃতীয় দিন অবধি যৌন মিলন এড়িয়ে যেতে হবে।

  • মিউকাস ইন্সপেকশন মেথড 

সাধারণত মহিলাদের ঋতুস্রাবের ঠিক পরে চটচটে শ্লেষ্মা স্রাব বেরোতে থাকে যোনি

থেকে। এই দিনটিকে মূল দিন হিসেবে ধরা হয়। এই দিনগুলিতে যৌন মিলন না করাই

শ্রেয়।

  • সিম্পটোথার্মাল মেথড

এই পদ্ধতিটি বেসাল বডি টেম্পারেটার মেথড এবং মিউকাস ইন্সপেকশন মেথডের সংমিশ্রণ।    দুটি পদ্ধতি মানার পাশাপাশি স্তনের কোমলতা, পেটে ব্যথা ইত্যাদির মতো অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তনগুলিও নজর রাখতে হবে। এই পদ্ধতিতে তাপমাত্রা বাড়ার তৃতীয় দিন এবং তৃতীয়, চতুর্থ দিন পর্যন্ত চটচটে শ্লেষ্মা স্রাব বেরোতে পারে সেদিন থেকেই যৌন মিলন  এড়ানো উচিত।

  • ওভুলেশন ইন্ডিকেটিং টেস্টিং কিট 

ডিম্বস্ফোটনের কিটগুলি লুটেইনাইজিং হরমোন (এলএইচ) সনাক্তকরণের ভিত্তিতে হয় যা ডিম্বস্ফোটনের এক বা দুই দিন আগে বৃদ্ধি পায়। তা দেখে বোঝা যায় যে দম্পতিকে ঠিক কখন যৌন মিলন এড়াতে হবে।

  • উইথড্রল মেথড

এই পদ্ধতিতে সহবাসের ক্ষেত্রে পুরুষটির বীর্যপাতের সময় বীর্যটি যাতে যোনিতে পৌঁছাতে দেয় না , একেই উইথড্রল মেথড বলে (4)

  • ল্যাকটেশনাল ইনফার্টিলিটি 

এই পদ্ধতিটি নতুন মায়েদের জন্য। এই পদ্ধতিটি কার্যকর হতে পারে যদি মা ছয় মাস ধরে শিশুকে কেবলমাত্র বুকের দুধ খাওয়ান এবং সেই সময়ের মধ্যে ঋতুচক্র না হয়  (4)

  • অ্যাবস্টিনেন্স

এই পদ্ধতিতে পুরোপুরিভাবে যৌন সঙ্গম থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। যতদিন পর্যন্ত আপনি প্রেগন্যান্ট হতে চান না, ততদিন পর্যন্ত। তবে এই নিয়ে নিজের সঙ্গীর সঙ্গে খোলাখুলি ভাবে কথা বলে নেবেন।

  • কিছু কিছু ফল ও শাক-সবজি আছে প্রেগন্যান্সি রোধে সাহায্য করে । নিচে সেগুলি উল্লেখ করা হল (5), (6)
  • কাঁঠাল
  • অনারস
  • পেঁপে
  • বুনো গাজরের বীজ নিষেক প্রতিরোধ করে
  • রাঙালু গর্ভনিরোধক হিসাবে কাজ করে বলে মনে করা হয়
  • স্মার্টউইডের (পলিগনাম হাইড্রোপাইপার) পাতাগুলি রটিন এবং গ্যালিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ বলে মনে হয় যা গর্ভাবস্থায় হস্তক্ষেপ করে
  • নিম বীর্যরোধক হিসাবে ব্যবহৃত হয়
  • ক্যাস্টর বিনের বীজকে অ্যান্টি-ফার্টিলিটি ক্রিয়াকলাপ দেখায়
  • পুদিনা পাতাগুলিতে স্পার্মাইসাইডের বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে জানা যায়।

গর্ভাবস্থা এড়ানোর জন্য যেসব সাবধানতা মেনে চলা উচিত

  • প্রেগন্যান্সি রোধ করতে চাইলে প্রথমেই ডাক্তারের পরামর্শ নিন, তারপর উপরে উল্লেখিত উপায়গুলি মানবেন।
  • অনেক সময় মহিলারা ভুল ওষুধ খেয়ে নিজেদের শরীরের ক্ষতি করে ফেলেন, তাই আপনার সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলুন এ সম্পর্কে।
  • এই সব উপায়গুলি মানার পর যদি কোনোরকম শারীকিক সমস্যা হয়, শীঘ্রই ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

গর্ভাবস্থা এড়াতে ব্যবহৃত ওষুধ

আই-পিল একটি জরুরী গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট বা পিল যা মহিলাদের অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ এড়াতে সহায়তা করে। এতে প্রোজেস্টি‌ন হরমোন রয়েছে, যা মাসিক চক্রকে উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে। এটি তখনই ব্যবহার করা উচিত যখন কোনো মহিলা যারা সন্দেহ করে যে নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়েছে (উদাহরণ, সঙ্গমের সময় কন্ডোম ছিঁড়ে গেলে )। এটি একটি জরুরী গর্ভনিরোধক পিল হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী গর্ভনিরোধের জন্যও নির্ধারিত করা হয় অনেকসময় । যখন এটি একবার ব্যবহার করা হয়, তখন এই পিলটি মুখ দিয়ে জলের সাহায্যে গিলে নিতে হয়  অথবা যোনিপথের মাধ্যমে ভিতরে ঢোকানো হয়। দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য আপনি যদি এই পিলটি গ্রহণ করার পরিকল্পনা করেন তবে এটি আপনার পক্ষে নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করতে আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত। তবে আপনাকে অবশ্যই যৌনমিলনের ৭২ ঘন্টার মধ্যে এটি গ্রহণ করতে হবে। এই ট্যাবলেট আপনার মাসিক চক্রকে প্রভাবিত করে । এছাড়া এতে বমি বমি ভাব, হালকা মাথা ধরা, ক্লান্তি বা অবসাদ, ডায়রিয়া এবং পেট ব্যথা হতে পারে । যদি আপনি আপনার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান বা গর্ভবতী বা ডায়াবেটিক হন তাহলে এই পিলটি গ্রহণ করবেন না।

নানা ধরণের প্রক্রিয়ার কথা জানলেন, আশা করি এবার সঠিক প্রক্রিয়াটি অবলম্বন করতে পারবেন। তবে এইসব প্রক্রিয়া শুরু করার আগে নিজের সঙ্গী ও ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে কিন্তু ভুলবেন না। নিজের যত্ন নিন ও সুস্থ থাকুন।

References: