গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যথার কারণ ও প্রতিরোধ | Stomach pain pregnancy - Causes, Treatment And Prevention

Image: Shutterstock

IN THIS ARTICLE

গর্ভাবস্থায় অনেক সময় তলপেটে বা পেটে ব্যথার সমস্যায় ভোগেন মহিলারা। এটি প্রথম ট্রাইমেস্টারেই ঘটে থাকে বলে জানা যায়। হজমের গন্ডগোল, জরায়ুতে রক্ত চলাচলের বৃদ্ধির জন্য এই ব্যথা হতে পারে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টারেও হতে পারে এই ব্যথা লিগামেন্টের ব্যথা সহ (1)

কিন্তু অনেকসময় অন্যকোনো সমস্যার জন্যও পেটে ব্যথা দেখা দিতে পারে, তাই অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।

গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যথা হওয়া কি স্বাভাবিক?

গর্ভবতী মহিলাদের সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে একটি হল পেটে ব্যথা, সেটি পেটের উপরের দিকেও হতে পারে বা নিচের দিকে। কিছু মহিলাদের ক্ষেত্রে, এটি গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টারে  শুরু হয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টারেও হয়ে থাকে, তবে এর সংখ্যা কম। তাই এই ব্যথাকে গর্ভাবস্থার সাধারণ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কিন্তু এটি কতগুলি কারণের জন্য হয়ে থাকে, তাই এটি প্রতিরোধ করাও সম্ভব। আসুন জেনেনি সেই কারণগুলি।

গর্ভাবস্থায় পেটের ব্যথার প্রকারগুলি কি কি ?

গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যথার প্রকারগুলি নিচে উল্লেখ করা হল।

উপরের পেটে ব্যথা

গর্ভাবস্থায় নাভির চারিদিকে অর্থাৎ দেহের পুরো মাঝখানের পেটের অংশে যদি ব্যথা হয়, তাহলে এটিকে উপরের পেটে ব্যথা হিসেবে ধরা হয়।

উপরের পেটের বামদিকের অংশে ব্যথা

বামদিকের স্তনবৃন্ত থেকে নাভি পর্যন্ত যদি ব্যথাটি হয়, তাহলে সেটিকে উপরের পেটের বামদিকের অংশে ব্যথা হয়েছে বলে ধরা হয়।

উপরের পেটের ডানদিকের অংশে ব্যথা

ডানদিকের স্তনবৃন্ত থেকে নাভি পর্যন্ত যদি ব্যথাটি হয়, তাহলে সেটিকে উপরের পেটের ডানদিকের অংশে ব্যথা হয়েছে বলে ধরা হয়। এই ব্যথাটি মূলত হয় লিভার, ডান শ্বাসযন্ত্রের নিচের অংশের ডান কিডনি, হাড় বা পেশির জন্য।

নিচের পেটে ব্যথা

গর্ভাবস্থায় নাভির নিচের দিকে ব্যথা হলে তাকে পেটের নিচের অংশে ব্যথা হচ্ছে বলে মানা হয়। এটি সুপ্রাপিউবিক পেন হিসেবেও পরিচিত (2)

নিচের পেটের বামদিকের অংশে ব্যথা

গর্ভাবস্থায় নিচের পেটে ব্যথা হলে বেশিরভাগ জনেরই নিচের পেটের বামদিকেই হয়ে থাকে। এর জন্য দায়ী কিডনির নিচের অংশের বাম দিক, জরায়ুর বাম অংশ, ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব, ব্লাডারের কিছু অংশ ও পেশী (3)

নিচের পেটের ডানদিকের অংশে ব্যথা

নিচের পেটের ডানদিকের অংশে ব্যথা মূলত হয় দেহের ওই অংশে থাকা অঙ্গের জন্য যেমন ডিম্বাশয়ের ডান অংশ, কিডনির নিচের অংশ, ফ্যালোপিয়ান টিউব, পেশি ইত্যাদির জন্য।

গর্ভাবস্থায় পেটের ব্যথার কারণ

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে বা অন্য সময় পেটে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। কিন্তু যদি এই ব্যথা বেশ অনেকদিন ধরে চলছে ও তীব্র যন্ত্রনা হয়, তবে অবশ্যই আপনার স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নিচে কিছু সাধারণ কারণ দেওয়া হল, যার জন্য গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যথা হতে পারে।

1. রাউন্ড লিগামেন্ট পেন

গর্ভাবস্থার দিন বাড়তে থাকলে জরায়ুর আকারও বড়ো হতে থাকে এবং জরায়ু থেকে শুরু হয়ে কুঁচকিতে শেষ হওয়া রাউন্ড লিগামেন্ট প্রসারিত হয়। ফলে নিচের পেটে ব্যথা হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি নিজে থেকে কমে যায় বা ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয় না (4)

2. গ্যাস এবং কোষ্ঠকাঠিন্য

গর্ভাবস্থায় অনেক সময়ই হজমের গন্ডগোল বা পায়খানা পরিষ্কার না হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, কারণ এই সময় শরীরে প্রোজেস্টেরন হরমোনের পরিমান বেড়ে যায়। তাই গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ট্র্যাক্টের কার্য ধীর গতিতে হতে শুরু করে, তাই হজমের গন্ডগোল হতে শুরু করে। তাই এই সময় বেশি ফাইবার যুক্ত খাবার ও প্রচুর জল খাওয়া উচিত। প্রয়োজনে স্টুল সফ্টনারও খেতে পারেন (5)

3. ব্র্যাক্সটন–হিকস সংকোচন

ব্র্যাক্সটন হিকস সংকোচন প্রকৃত সংকোচনের থেকে অনেকটাই আলাদা, যা আরও ঘন ঘন ঘটে এটি (6) । দীর্ঘ সময় ধরে এটি চলতে পারে এবং খুব বেদনাদায়কও হতে পারে। এই সংকোচন ডিহাইড্রেশনর কারণেই মূলত হয়ে থাকে। তাই প্রচুর পরিমাণে জল পান করা উচিত এবং তার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত বিশ্রাম এর থেকে মুক্তি দিতে পারে ।

4. জরায়ুর আকার বৃদ্ধি

গর্ভাবস্থায় দিন বাড়তে শুরু করলে জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পেতে থাকে, ফলে দেহের বর্জ্য পদার্থ থাকার জায়গা কমে আসে, পেটে ব্যথা শুরু হয় (7)

5. মূত্রনালীর সংক্রমণ

প্রায় ১০% গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভাবস্থায় মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউটিআই) হয়ে থাকে। ইউটিআই দ্রুত সনাক্ত করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে, তবে এই সমস্যাটি ঠিক না হলে মহিলাদের কিডনিতে গুরুতর সংক্রমণ হতে পারে যা অকাল প্রসবের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।

6. এক্টোপিক গর্ভাবস্থা

এক্টোপিক গর্ভাবস্থা তৈরি হয় যখন ডিম্বাণুটি জরায়ু ছাড়া অন্য কোনো স্থানে রোপিত হয়। বেশিরভাগ সময়ই ডিম্বাণুটি ফ্যালোপিয়ান টিউবে গিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। প্রতি ৫০টি প্রেগন্যান্সির মধ্যে একটি এক্টোপিক গর্ভাবস্থা ঘটে বলে জানা যায় (8)

7. গর্ভস্রাবের জন্য

প্রথম ট্রাইমেস্টারের সময় তীব্র পেট ব্যাথা মহিলাদের জন্য গর্ভস্রাব হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (9) । তাই এই ব্যথা তীব্র হলেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

8. প্ল্যাসেন্টার ছেদন

এটি গর্ভস্থ শিশুদের জন্য একটি খুব সঙ্কটজনক ব্যাপার। গর্ভাবস্থার সময় শেষ হওয়ার আগে জরায়ু থেকে প্ল্যাসেন্টা (যা শিশুর জন্য অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করে) আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে থাকে । সাধরণত এই ধরনের ঘটনা সংখ্যায় ২০০টির মধ্যে একটি ঘটে থাকে এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে এটি ঘটার সম্ভাবনা থাকে  (10)

গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যথার প্রতিরোধ কি করে করবেন ?

যদি আপনার অল্প থেকে মাঝারি ধরণের ব্যথা হয়, তবে নিচের উপায়গুলি মেনে চলতে পারেন। তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মেনে এগুলি পালন করবেন।

  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন ও হাঁটা চলা করার অভ্যেস রাখুন
  • বিশ্রাম করুন দরকার মতো
  • প্রচুর জল পান করুন
  • ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খান
  • প্রত্যেকবার অল্প অল্প করে খাবার খান
  • মূত্রাশয় খালি রাখার চেষ্টা করুন।

আপনার কখন ডাক্তার দেখানো উচিত ?

গর্ভাবস্থায় যখন এই ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকবে বা বেশ কিছুদিন ধরে স্থায়ী হবে, তখন অবশ্যই আপনাকে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব না করাই ভালো।

নিচে উল্লেখ করা হল কিছু সম্ভাব্য অবস্থা যখন আপনার ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

  • যখন আপনার পেটে ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে জ্বরও আছে
  • ঋতুস্রাব শুরু হবে
  • মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব হলে
  • প্রস্রাব করার সময় ব্যথা হলে বা সমস্যা হলে
  • হাত পা ফুলে উঠলে
  • খুব ঠান্ডা বা গরম ভাব বা জ্বলন ভাব অনুভব করলে

যদিও গর্ভাবস্থায় অল্প পেটে ব্যথা হওয়া অনেকেই সাধারণ বলে মনে করেন। কিন্তু তাই বলে এটি উপেক্ষা করা উচিত নয়। পেটে ব্যথা হলে সেটি তীব্র হওয়ার আগে নিরাময় করার নিয়মগুলি পড়ে নিন এবং ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করার পর ডাক্তার যা বলবে সেগুলি মানুন । গর্ভাবস্থার এই সুন্দর সময়টিতে আনন্দে থাকুন ও সুস্থ থাকুন।

References :

Was this information helpful?