৫ মাস গর্ভাবস্থার লক্ষণ, শিশুর বিকাশ এবং ডায়েট সংক্রান্ত কিছু টিপস | 5 Months Pregnant: Symptoms, Baby Development And Diet Tips

Image: Shutterstock

IN THIS ARTICLE

৫ মাসে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার শুরু হয়ে যায়। এই পর্যায়ে গর্ভস্থ শিশু অনেকটাই বড় হয়ে যায়। হবু মায়ের বেবি বাম্প স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পেলভিসে জরায়ুর জন্য যতটা জায়গা বরাদ্দ থাকে সেই তুলনায় আকারে বেড়ে যায়। জরায়ুর আকার এইসময় বেড়ে পেঁপের মতো হয়। জরায়ু উপরের দিকে এবং বাইরের দিকে বাড়তে থাকে। প্রেগন্যান্সির প্রথম পর্যায়ে যে যে সমস্যা দেখা দেয় তার বেশিরভাগ এইসময় কমে যায়। গর্ভাবস্থার ৫ মাস মানে আপনি আপনার সম্পূর্ণ গর্ভদশার প্রায় মাঝ পথে অবস্থান করছেন। এইসময় ভ্রুণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যেহেতু গর্ভস্থ শিশুটি বড় হতে থাকে, এইসময় বেশিরভাগ গর্ভবতী মহিলার ওজন বাড়ে।

আমাদের এই প্রতিবেদনে, পাঁচ মাসের মাথায় গর্ভবতী মহিলার শরীরে কী কী পরিবর্তন দেখা দেয়, শিশুর শারীরিক বিকাশ এবং কোন কোন বিষয়ে অবশ্যই আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হল।

গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে কি কি লক্ষণ দেখা যায় ?

পাঁচ গর্ভাবস্থায় সাধারণত যেসব উপসর্গগুলি দেয় তার মধ্যে হল (1) (2)

  • ওজন বৃদ্ধি

বিএমআই (BMI) অনুসারে ওজন বৃদ্ধি পায় (3)

গরগর্ভাবস্থার সময়বিএমআই<২৫বিএমআই ২৫-৩০বিএমআই > ৩০
৫ মাস২-৪ কেজি১-২কেজি থেকে ২ কেজি০-২ কেজি থেকে ১-২
  • শ্বাসকষ্ট

জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ডায়াফ্রামের উপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন নিশ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দেয়।

  • মাথা যন্ত্রণা

হরমোনের ওঠানামার কারণে মাথা ব্যথা হতে পারে।

  • ক্লান্তিভাব

এইসময় শরীর যেহেতু গর্ভস্থ ভ্রুণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য আরও বেশি কাজ করে, তাই আপনি মাঝে মধ্যেই ক্লান্ত বোধ করতে পারেন।

  • মাথা ঘোরা

হরমোনের ওঠানামার কারণে মাঝে মধ্যে মাথা ঘোরাতে পারে।

  • শিরায় টান ধরা

এইসময় ভিটামিনের ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন এবং অত্যধিক কাজকর্ম করা বা একেবারেই কিছু না করার কারণে পায়ে ক্র্যাম্প বা শিরায় টান ধরতে পারে (3)

  • নাক বন্ধ

অনেকেরই এই উপসর্গ দেখা দেয়। মাঝেমাঝে নাক বন্ধ এবং শ্লেষ্মা বের হয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য

গর্ভাবস্থায় হরমোনের উত্থান-পতন কোষ্ঠকাঠিণ্যের অন্যতম কারণ। প্রোজেস্টেরণ হরমোন বৃদ্ধির কারণে কোষ্ঠকাঠিণ্য দেখা দেয়, যা সমগ্র দেহের পেশিগুলিকে শিথিল করে, যার মধ্যে পরিপাক নালীও রয়েছে। সেইকারণে খাদ্য অথবা অবশেষ্টাংশ অন্ত্রের মধ্যে খুব ধীরে ধীরে যায়।

  • হার্ট বার্ন বা গলা-বুক জ্বালা

গর্ভাবস্থাকালীন যে উপসর্গগুলি দেখা দেয় তার মধ্যে এটি অন্যতম। কিছু সময়ের জন্য হতে পারে আবার পুরো গর্ভাবস্থায় এটি ভোগাতে পারে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হজমে সমস্যা হয়, সেই সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্যও দেখা দেয়।

  • পিঠে ব্যথা

শিশুর ওজন বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে পিঠের নিচের অংশ বা সায়াটিক নার্ভের উপর চাপ পরে। এর থেকে পিঠে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়।

  • খিদে বাড়ে

গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে মর্নিং সিকনেস, বমি ভাব, অরুচি থাকলেও এই পর্যায়ে তেমন কোনও সমস্যা থাকে না। বরং খাওয়ার ইচ্ছে বাড়ে।

  • ঘন ঘন প্রস্রাব

ক্রমবর্ধমান জরায়ু মূত্রাশয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে, ফলত ঘন ঘন প্রসাব হয়।

  • অনিদ্রা

পিঠে ব্যথা, ঘন ঘন প্রসাব, পায়ে ক্রাম্প ইত্যাদি কারণে ঘুম ঠিকঠাক হয় না।

  • এডিমা

গর্ভাবস্থায় হাত, পা ফুলে যাওয়া (এডিমা) খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। গর্ভস্থ শিশুর প্রয়োজনার্থে একজন গর্ভবতী মহিলা তার দেহে আৎ অতিরিক্ত ৫০% তরল সরবরাহ করে, এই অতিরিক্ত তরলের কারণে দেহের বিভিন্ন অংশ ফুলে ওঠে।

  • মাড়িতে রক্তক্ষরণ

হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় মাড়ি থেকে রক্ত পরে।

এগুলি উপসর্গগুলি ছাড়াও, আপনি অন্য কোনও শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারেন।

গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে গর্ভবতীর শারীরিক পরিবর্তন

প্রেগন্যান্সির সময় গর্ভবতী মহিলার শরীরে প্রতিদিন নানা পরিবর্তন আসে। কখনও ঠিকঠাক ঘুম হয় না, কখনও আবার সারাক্ষণ অস্বস্তি বোধ হয়। গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে সাধারণত যে সকল শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায় সেগুলি হল-

বেবি বাম্প – সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে ছোট বেবি বাম্প অনুভব করতে পারবেন। শিশুর বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে এইসময় জরায়ুর আকার বাড়তে থাকে। বেবি বাম্প স্পষ্ট বোঝা যায়।

স্তনের আকার বৃদ্ধি পায় – স্তনে দুধের উৎপাদন শুরু হয়ে যায়, তাই এটি আকারে বড় দেখায়।

কোলোস্ট্রাম – স্তন থেকে নিসৃত হলদেটে দুধ, এটি মায়ের প্রথম দুধ নামেও পরিচিত। গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে এটি তৈরি হতে শুরু হয়ে যায়।

স্ট্রেচ মার্কস – জরায়ুর আকার বৃদ্ধি এবং ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের উপর স্ট্রেচমার্কস ফুটে ওঠে। গর্ভাবস্থায় সাধারণত পেট, স্তন এবং নিতম্বের চারপাশে সবচেয়ে বেশি স্টেচমার্কস দেখা যায়। ত্বকের তুলনায় শরীরের দ্রুত বৃদ্ধি এবং প্রসারণের কারণে ত্বকের ভিতরের ফাইবার বা তন্তু ভেঙে যাওয়ার কারণে স্ট্রেচমার্কস সৃষ্টি হয়।

লিনিয়া নিগ্রা – লিনিয়া নিগ্রা বা প্রেগন্যান্সি লাইন এইসময় আরও গাঢ় হতে থাকে। নাভি থেকে তলপেটের নিচে পর্যন্ত যে কালো দাগ দেখা যায় তালে লিনিয়া নিগ্রা বলে।

ত্বক কালচে হয় – হরমোনের ওঠা-নামার কারণে শরীরে মেলানিনের উৎপাদন বেড়ে যায় যা অনেকসময় গর্ভবতী মহিলার ত্বকের বিভিন্ন অংশকে কালো করে দেয়।

শারীরিক পরিবর্তন ছাড়াও এই সময় মানসিক কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় –

মুড সুইং – হরমোনের ওঠানামার কারণে ঘন ঘন মুড বদলাতে থাকে।

স্ট্রেস – গর্ভস্থ শিশুর সুস্বাস্থ্য, শিশুর জন্ম ইত্যাদি নানা কারণে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।

ভুলে যাওয়া – হরমোনের ওঠানামার কারণে এইসময় আপনি কোনও জিনিস ভুলে যেতে পারেন অথবা ভুল করতে পারেন। তবে এতে চিন্তার কিছু নেই। গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে এটা স্বাভাবিক।

পাঁচ মাসের গর্ভাবস্থায় শিশুর বিকাশ

গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাস হল ১৭ থেকে ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত (4)। শিশু খুব দ্রুত বেড়ে ওঠে, এই সময় গর্ভস্থ ভ্রুণের আকার একটি কলার সাইজের হয় (5)

শিশুর ওজন (6) – প্রায় ৫ থেকে ১০ আউন্স (১৪০-৩০০ গ্রাম) ।

শিশুর দৈর্ঘ্য – প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হতে থাকে আপনার ছোট্ট সোনা। এইসময় গর্ভস্থ শিশু গ্রায় ৮-১২ ইঞ্চি লম্বা হয়ে ওঠে।

এই মাসে শিশুর বিকাশ কীভাবে হয় তা নিচের চার্টে তুলে ধরা হল (7) (8) (9)

শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গডেভেলপমেন্ট
ত্বকভার্নিস কেসোসা শিশুর ত্বকের প্রতিরক্ষামূলক একটি স্তর। এর চিটচিটে উপাদান ত্বককে আচ্ছাদিত করে এবং সুরক্ষা দেয়।
চুলমাথায় চুল বাড়তে শুরু করে।
লেনুগোএই পর্যায়ে ভ্রুণের সারা শরীর লেনুগো (সুক্ষ্ম লোম) দ্বারা আবৃত হতে শুরু করে। এটি মূলত ভ্রুণকে অ্যাম্নিওটিক ফ্লুয়িড থেকে রক্ষা করে এবং ত্বকে উষ্ণ বজায় রাখে।
চোখভ্রু, চোখের পাতা গঠিত হতে শুরু করে।
হার্টশিশুর হার্ট রেট দৈনিক চক্র অনুসরণ করে যার নাম সার্কেডিয়ান রিদম বা বায়োলজিক্যাল ক্লক।
ভোকাল কর্ডপরিপূর্ণতা পায়।
কানমাথার দুপাশে বাচ্চার কান আকার নিতে শুরু করে। কানের গঠন তৈরি হওয়ার পর থেকে শিশু শুনতে পায়।
যৌনাঙ্গএই পর্যায়ে শিশুর যোনির বিকাশ ঘটে।
নার্ভমেলিন নামক টিস্যু দিয়ে আচ্ছাদিত হতে শুরু করে।
হাত ও পায়ের ছাপএই পর্যায়ে শিশুর ফিঙ্গারপ্রিন্ট (হাতের ছাপ) এবং ফুটপ্রিন্ট (পায়ের ছাপ) বিকাশ পায়।

এটি সম্ভবত সেই আনন্দের মুহূর্ত যখন আপনি আপনার গর্ভস্থ সন্তানের আন্দোলনও অনুভব করতে পারবেন।

পঞ্চম মাসে শিশুর অবস্থান এবং আন্দোলন

অবস্থান – বাচ্চার ঘোরাফেরা করার জন্য গর্ভের মধ্যে প্রচুর ফাঁকা জায়গা রয়েছে। তাই, এই মাসে শিশু নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় থাকে না।

নড়াচড়া – এই মুহূর্তে শিশুর নড়াচড়া কিছুটা অনুভব করা যায়। পেটের মধ্যে স্ট্রোকের মত ধাক্কা বা গ্যাসের মত বুদবুদ হতে পারে। প্রথমবার যারা মা হচ্ছেন তাদের এই অনুভবটিকে সনাক্ত করতে সমস্যা হতে পারে (10)

মা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য সঠিক পরিমাণে সঠিক খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য যে সমস্ত খাবার প্রস্তাবিত নয়, এমন খাবার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।

গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসের ডায়েট

এই সময় নিজের যত্ন না নিলে সন্তানের যত্নেও যে খামতি থেকে যাবে। তাই হবু মায়েদের খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে বাড়তি নজর দিতে হবে। যে খাবারগুলি এইসময় খাবেন সেগুলি হল (11)

  • প্রচুর পরিমানে সবুজ শাকসবজি, দুধ সহ ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রোজকার ডায়েটে রাখুন। গর্ভস্থ শিশুর হাড় ও দাঁত মজবুত করতে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান।
  • আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খান, এটি লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। সবুজ শাক-সবজি, শস্য, ড্রাই ফ্রুট, মটরশুটি ইত্যাদি খাদ্য তালিকায় রাখুন।
  • এইসময় ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট খুব দরকার। এটি শিশুর মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত জন্মগত অক্ষমতাগুলি প্রতিরোধ করে। তাই ডায়েটে রাখুন সবুজ শাকসবজি (পালং শাক, ব্রকলি, লেটুস), রাজমা, ডাল, বাদাম, সাইট্রাস ফল এবং মটরশুটি।
  • ভিটামিন ডি দৃষ্টিশক্তিকে সুস্বাস্থ্যকর এবং দাঁত ও হাড় শক্তিশালী করে। সালমন এবং দুধ ভিটামিন ডি-এর অন্যতম উৎস।
  • খাদ্যতালিকায় যোগ করুন ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার, যেমন কমলা লেবু অথবা হলুদ শাকসবজি (মিষ্টি আলু বা গাজর), সবুজ শাকসবজি, দুধ। এটি হাড় শক্ত করে এবং স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিশক্তি গড়ে তোলে।
  • প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গর্ভস্থ সন্তানের মসৃণ শারীরিক বিকাশ সুনিশ্চিত করে। ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম, ছোলা, কটেজ চিজ়, ডিম ও দুধ প্রোটিনের অন্যতম উৎস যা পাঁচ মাস গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপকারী।
  • আপনার ডায়েটে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন সাইট্রাস ফল, স্ট্রবেরি, টম্যাটো এবং ব্রকলি যোগ করুন। এটি দাঁত, মাড়ি এবং হাড় শক্ত করে।
  • সুষম খাবারের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে জল খেতে হবে।
  • এবার জেনে নিন গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে কোন কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন।

কী কী খাবেন না

১. ফাস্টফুড একেবারে এড়িয়ে চলুন। যতটা সম্ভব বাড়ির তৈরি সুষম খাবার বিশেষ করে ফল, শাক সবজি খান।
২. কাঁচা বা আধসেদ্ধ ডিম গর্ভাবস্থায় খাবেন না। কারণ কাঁচা ডিমে সালমনেল্লা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে, তা থেকে ডায়েরিয়া, ফুড পয়েজনিং, জ্বর, বমি, পেটে ব্যথা হতে পারে (12)
৩. দোকান বা রেস্তোরাঁ থেকে চিংড়ি মাছ কিনে খাবেন না। মাছের স্বাদ ও গন্ধ বজায় রাখতে অনেকসময় চিংড়ি মাছ ভালো করে সেদ্ধ করা হয় না বা পরিষ্কারও ঠিকঠাক করে না। চিংড়ি মাছ প্রোটিন এবং ওমেগা ৩-এর ভালো উৎস হলেও আধসেদ্ধ চিংড়ি হবু মায়ের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে।
৪. মার্কারি যুক্ত মাছ এড়িয়ে চলুন। কারণ এটি শিশুর মস্তিষ্ক এবং সার্বিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সোর্ড ফিস, কিং ম্যাকারেল, টাইল ফিস এবং সার্ক -এর মতো মাছগুলো এড়িয়ে চলুন।
৫. গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ক্যাফাইন গ্রহণ জন্মের পর শিশুর বিশ্রামহীনতা, অনিদ্রার পাশাপাশি গর্ভপাতেরও কারণ হতে পারে। চা, কফি অবং চকোলেটের মধ্যে ক্যাফাইন থাকে, তাই এগুলি এড়িয়ে চলাই ভালো (13)
৬. আনপাস্তুরাইজড দুধে অনেক রকম ক্ষতিকারক মাইক্রোবস থাকে যা আপনার এবং আপনার গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। ডায়েটে দুধ অবশ্যই রাখুন। তবে ভালো করে ফুটি তবেই দুধ খান।
৭. যাদের সিলিয়াক ডিজিজ (গ্লুটেনের অসহিষ্ণুতা) রয়েছে, সেইসব গর্ভবতী মহিলাদের গম, বার্লি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা ভালো (14)। অনেকক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা পাউরুটি খেতে মানা করে থাকেন।
৮. বুকে জ্বালা ভাব, হজমের সমস্যা এড়াতে বেশি ভাজাভুজি এবং অতিরিক্ত তেল মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। সহজপাচ্য খাবার খেলে আপনার শরীর ঝরঝরে থাকবে কোনও সমস্যা হবে না।
৯. গর্ভাবস্থার কোনও অবস্থাতেই মদ্য পান বা অ্যালকোহল সেবন উচিত নয়। অ্যালকোহল মায়ের রক্তের সঙ্গে মিশে শিশুর রক্তে চলে যায়, শিশুর মস্তিষ্ক এবং শিরদাঁড়ার ক্ষতি করতে পারে।
সাবধান তো থাকতেই হবে, তার পাশপাশি আপনি এবং আপনার গর্ভের সন্তান দুজনেই সুস্থ আছেন কিনা আনতে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।

গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে স্ক্যান/আল্ট্রাসাউন্ড

গর্ভধারণের পঞ্চম মাসে চিকিৎসকেরা সাধারণত এই সমস্ত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন :

শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা :

১. ব্লাড প্রেসার
২. ওজন
৩. প্রোটিন ও সুগার লেবেল জানতে ইউরিন টেস্ট
৪. মৌলিক উচ্চতার পরিমাপ

অন্য়ান্য পরীক্ষা :

১. আলট্রাসাউন্ড : এর থেকে যে যে বিষয়গুলি দেখা হয়,

  • এই স্ক্যানের উদ্দেশ্য ভ্রুণের কাঠামোগত কোনও অস্বাভাবিকতা হয়েছে কিনা তার সন্ধান করা।
  • ডাক্তারবাবু এই স্ক্যানের দ্বারা আপনাকে সন্তানের মুখ, চেহারা, আঙুলের পাশাপাশি হৃদপিণ্ডের ছবিও দেখাতে সাহায্য করতে পারেন।
  • গর্ভস্থ ৫ মাসের শিশুর সুস্থতা, অবস্থান এবং প্লাসেন্টার অবস্থা যাচাই করার জন্য এই স্ক্যান করা হয়।
  • গর্ভাবস্থার সুস্থতা পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারবাবু স্ক্যান করানোর পরামর্শ দেন। বিস্তৃত এই স্ক্যানটিকে অ্যানোমালি স্ক্যানও বলা হয় (15)

২. আল্ট্রাসাউন্ডে কোনওরকম অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে ডাক্তারবাবু আরও কিছু ব্লাড স্টেট করানোর পরামর্শ দেন (16) । মায়ের রক্তের নমুনা নিয়ে এইসমস্ত পরীক্ষা করা হয় –

আলফা-ফেটোপ্রোটিন (এএফপি) – ভ্রুণের মধ্যে কোনওরকম অস্বাভাবিকতার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সনাক্তকরণের জন্য এই টেস্ট খুব জরুরি। এই পরীক্ষা থেকে বোঝা যায় –

  • গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে কোনও সমস্যা রয়েছে কিনা
  • সন্তানের মধ্যে ডাউন সিনড্রোম রয়েছে কিনা
  • আপনার জন্মগত ত্রুটির কোনও পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে কিনা
  • আপনি একাধিক ভ্রুণ বহন করছেন কিনা
  • আপনার গর্ভাবস্থার কোনও অবস্থায় রয়েছেন এবং প্রসবের নির্ধারিত তারিখ আবার গণনা করা হয়।

এইচসিজি : হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রিপন হল একটি হরমোন যা গর্ভাবস্থা সনাক্ত করতে সাহায্য করে। এইচসিজির মাত্রার উপর নির্ভর করে আপনার গর্ভে একটি না যমজ সন্তান রয়েছে।

এই পরীক্ষাগুলো যথেষ্ট না হলে বা কোনওরকম অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে ডাক্তারবাবু অতিরিক্ত কিছু স্ক্যান করাতে পারেন। সমস্যাগুলো ভালোভাবে সনাক্ত করা হলে সেইমতো চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দেন।

গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে কী কী সমস্যা দেখা দিতে পারে ?

নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি দেখা দিলে, দেরি না করে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যান (১৭, ১৮) –

  • রক্তপাত বা পেটে ব্যথা
  • ঘন ঘন পায়ে ক্রাম্প বা শিরায় টান ধরা
  • জ্বর জ্বর ভাব। ১০০.৪ ডিগ্রি বা তার বেশি জ্বর, সর্দি
  • প্রস্রাবের সময় তীব্র জ্বালা-ষন্ত্রণা বা কম প্রস্রাব হওয়া
  • গাঢ় বর্ণের প্রস্রাব
  • অত্যধিক বমি, ২৪ ঘণ্টা পরও কম না হওয়া
  • মাথা ঘোরা, ক্লান্তিভাব
  • যোনি স্রাব বেড়ে যাওয়া

গর্ভাবস্থায় কমবেশি সকলের কোনও না কোনও শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু সেগুলি যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তাহলে অবশ্য রুটিন চেক-আপ করিয়ে আগে থেকেই সর্তক হন।

গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাসে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে

প্রেগন্যান্সি যেমন ধৈর্যের তেমনই দায়িত্বের। গর্ভস্থ শিশুর যাতে কোনওরকম অসুবিধা না হয় তারজন্য বাড়তি যত্ন যেমন প্রয়োজন তেমনই এইসময় বিশেষ কিছু সাবধানতা মেনে চলাও খুব জরুরি। সন্তানের সঠিক লালনপালন করতে রইল এমনই কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ :

১. স্ট্রেস বা মানসিক চাপমুক্ত থাকুন।
২. প্রচুর জল খান।
৩. ধূমপান এবং মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
৪. যথেষ্ট পরিমানে বিশ্রাম নিন।
৫. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
৬. বসার, দাঁড়ানোর এবং ঘুমানোর সঠিক ভঙ্গিমাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যা ব্যথা, যন্ত্রণা কমাতে সাহায্য করবে, ঘুম অনেকবেশি আরামদায়ক হবে। শুয়ে বা বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়াবেন না। এর থেকে ব্লাড প্রেসার কমে যেতে পারে, এর ফলে আপনি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন কিংবা মাথা ঘোরাতে পারে (20)
৭. ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রসবপূর্ব ভিটামিনগুলি নিয়মিত খান।
৮. ভারী জিনিস তুলবেন না।
৯. অল্প অল্প করে বারে বারে খান।
১০. ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনও ওষুধ খাবেন না।
১১. ভারী ব্যায়াম না করলেও নিয়মিত একটু হাঁটাহাঁটি করুন। তাতে শরীর সুস্থ থাকবে।
১২. পর্যাপ্ত ঘুম দরকার, অন্তত ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমান।
১৩. নরম, সুতির জামাকাপড় পড়ুন। অনেক বেশি আরামবোধ করবেন।
১৪. আরামদায়ক জুতো বেছে নিন। হিল জুতোর পরিবর্তে ফ্ল্যাট জুতো পরতে শুরু করুন।
১৫. ক্ষতিকারক রাসায়নিক থেকে দূরে থাকুন।

এটা তো গেলে হবু মায়েদের জন্য জরুরি কিছু টিপস। প্রেগন্যান্সির সময় সব দায়িত্ব যে কেবলমাত্র মায়েদেরই তা কিন্তু নয়। সঙ্গীকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করাতে, হাসিখুসি রাখতে হবু বাবাদেরও কিছু বিষয় মাথায় রেখে চলতে হবে।

হবু বাবাদের জন্য কিছু টিপস

১. পারিবারিক কাজে যতটা সম্ভব আপনার স্ত্রীকে সাহায্য করুন।
২. স্ত্রীর জন্য বাড়িতে একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করুন।
৩. ডাক্তারের কাছে রুটিন চেক-আপের জন্য অবশ্যই স্ত্রীর সঙ্গে যান।
৪. মাঝে মাঝে দুজনে একসঙ্গে কাছেপিঠে কোথাও থেকে ঘুরে আসুন।
৫. স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে যান।
৬. রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার পা ও ঘাড়ে ভালো করে ম্যাসাজ করে দিন।

মা হওয়া মোটেই সহজ নয়। ন’মাসেরও বেশি সময় ধরে সন্তানধারণের পরীক্ষাটা আসলে ধৈর্যের। তিল তিল করে যখন সন্তান আপনার গর্ভে বেড়ে ওঠে, শরীরে নানা পরিবর্তন আসে। অনেক ব্যথা, যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। কিন্তু যেই মূহুর্তে আপনি আপনার ছোট্ট সোনাকে প্রথমবার নিজের কোলে নেবেন, বিশ্বাস করুন সমস্ত যন্ত্রণা এক নিমেশে ভুলে যাবেন। তাই নিজেকে সবসময় চিন্তামুক্ত রাখুন, ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করুন আর জীবনের এই সুন্দর অধ্যায়টি উপভোগ করুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসে আমার কতটা খাবার খাওয়া উচিত?

গর্ভবতী অবস্থায় আপনার শরীরের দরকার স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ স্বাস্থ্যকর খাবার। পাঁচ মাস গর্ভাবস্থায় আপনাকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩৪৭ অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। তবে সকলকে যে একই মাত্রায় খাবার খেতে হবে তা নয়। সকলের ক্ষেত্রে তা এক নাও হতে পারে। তাই আপনি আপনার শরীরের চাহিদা এবং খিদে অনুযায়ী খাবার খান।

গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসে আমার ওজন কতটা বাড়া উচিত?

গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে গর্ভবতী মহিলার ওজন অনেকটাই বাড়ে। আপনার স্বাভাবিক ওজন ছাড়াও মোট ৬ কেজি পর্যন্ত ওজন বাড়তে পারে। গর্ভস্থ শিশুর বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শরীরে আরও শক্তি প্রয়োজন হয়। তাই ওজন বাড়ানো এইসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

References:

1. Stages of pregnancy By U.S. Department of Health and Human Services
2. What happens in the sixth month of pregnancy? By Planned Parenthood Federation of America Inc (2019)
3. Leg cramps during pregnancy By Healthdirect
4. Pregnancy – week by week By Health and Human Services (2012)
5. Week by Week Fetus Size Demonstrated by Fruits By EPAOA (2014-2019)
6. Fetal Development By UNSW Embryology (2018)
7. Fetal development – month 5 By Sutter Health (2018)
8. Prenatal Form and Function – The Making of an Earth Suit By THE ENDOWMENT FOR HUMAN DEVELOPMENT, INC (2001-2019)
9. 18 Weeks Pregnant: Your Body Shape Begins to Change By National Women’s Health Resource Center, Inc
10. Quickening and Baby Movements: 4th, 5th, 6th, 7th, 8th Month By Sitaram Bhartia Institute of Science and Research (2016)
11. Nutrition During Pregnancy By ACOG
12. Listeria Infection (Listeriosis) By Organization of Teratology Information Specialists
13. Pregnancy Precautions: FAQs By The Nemours Foundation (1995-2019)
14. How Celiac Disease Affects Pregnancy By Celiac Disease Foundation (1998-2018)
15. Morphology scan By Healthdirect.
16. Common Tests During Pregnancy By Stanford Children’s Health (2019)
17. When to call us By Kaiser Foundation Health Plan, Inc (2018)
18. Prenatal care in your second trimester By NIH (2019)
19. What are some common complications of pregnancy? By NIH (2017)
20. Low Blood Pressure – When Blood Pressure Is Too Low By American Heart Association, Inc (2019)