১২ মাস বয়সী শিশুর বিকাশের প্রক্রিয়া এবং পর্যায়ঃ বিস্তারিত বিবরণ | 12 month Old’s Developmental Milestones In Bengali

Image: Shutterstock

IN THIS ARTICLE

দেখতে দেখতে আপনার ছোট্ট সোনা শিশুটা ১২ মাসের হয়ে উঠলো। ইতিমধ্যে শারীরিক এবং মানসিক দিক থেকে ও যে বড় হয়ে উঠেছে তার নানারকম প্রমাণ দিতেও শুরু করে দিয়েছে। আপনার কথাবার্তা শুনে সেই মতন কাজের অনুসরণ করা, আকারে ইঙ্গিতে সাধ্য মতন নিজের ভাবভঙ্গি বোঝানো ইত্যাদিতেও সক্ষম হয়ে ওঠে এই বয়সে শিশুরা। আপনার সন্তান এই সময়ে আপনার জন্য অনেক বিস্ময়কর মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করে। সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা এই বয়সের শিশুর সর্বাঙ্গীন বিকাশ, ওজন – উচ্চতা, শারীরিক বিকাশ, ঋতুভেদে নেওয়া প্রয়োজনীয় কিছু  সতর্কতা, টীকাকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বিশদে জানতে পারবো।

১২ মাস বয়সী একজন শিশুর ওজন এবং উচ্চতা কত হওয়া উচিৎ?

১২ মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেছে মানে আপনার শিশু তার জন্মের পর ১ বছর সময়কাল কাটিয়ে ফেললো। এই সময়কালের মধ্যে আপনার শিশু প্রতি সপ্তাহে ওজনে ৩ – ৫ আউন্স এবং প্রতি মাসে ১/২ ইঞ্চি উচ্চতায় বৃদ্ধি পায়। আর ১২ মাস বা প্রায় ১ বছর বয়সী শিশু কন্যার ওজন হয় ২১.৯ পাউণ্ড এবং শিশু পুত্রের ওজন হয় ২১.৩ আউন্স। ওজনের মতন উচ্চতার ক্ষেত্রেও শিশু পুত্র এবং কন্যার মধ্যে তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। এই বয়সে শিশু কন্যার উচ্চতা হয় ২৯.১ ইঞ্চি এবং শিশু পুত্রের উচ্চতা হয় ২৯.৮ ইঞ্চি। (1)

১২ মাস বয়সী শিশুর বিকাশের মাপকাঠি কী কী?

মূলত তিনটি আলাদা আলাদা স্তর থেকে শিশুর বিকাশ সাধিত হয়। সেগুলি হলো যথা –  বৌদ্ধিক, শারীরিক এবং মানসিক। এই তিনটি স্তরেই শিশুর বিকাশ প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়।

বৌদ্ধিক বিকাশের মাপকাঠি –

বিকাশের এই স্তরে শিশু তার মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে নানাবিধ কাজকর্ম সুষ্ঠভাবে করে থাকে। যেমন –

  • লুকিয়ে রাখা জিনিসপত্র সহজেই খুঁজে বের করে ফেলে – এই বয়সে বাচ্চারা আর তাদের থেকে আড়ালে রাখা বস্তু বা জিনিস পত্র চোখের সামনে দেখতে না পেলে আর বায়না করেনা বরং সে নিজেই লুকিয়ে রাখা বস্তুটিকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে।
  • চেনা জিনিস গুলিকে স্বস্থানে খোঁজার অভ্যাস – আপনার শিশুর খেলনা গুলিকে যদি একটা নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিদিন রাখেন তাহলে দেখবেন যখনই তার ঐ খেলনাগুলির দরকার হবে সে ঐ খেলনা রাখার স্থানেই তাকিয়ে থাকবে। এইভাবে একদিকে যেমন শিশুর দৃষ্টি শক্তি উন্নত হয় অন্যদিকে স্মৃতি শক্তিও অল্প অল্প করে গড়ে ওঠে। (2)
  • বিভিন্ন দ্রব্যাদি কে স্বনামে চিনতে শেখে – এই বয়সের শিশুকে কোনো ফল বা সব্জির নাম করলে সে অনায়াসেই তার সামনে রাখা ঝুড়ি থেকে সেগুলিকে চিহ্নিত  করতে পারে। এই সময় শিশুরা তাদের রোজের ব্যবহার্য জিনিসপত্রের নামও মনে রাখার ক্ষেত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠে। (3)
  • প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি উপযোগ অনুসারে সেগুলিকে ব্যবহার করতে জানা – ১২ মাস বয়সী শিশুরা তাদের চুল আঁচরানোর জন্য চিরুনীকেই বেছে এবং সেটা ঠিক ভাবে ধরতেও সক্ষম হয়। শুধু চিরুনী বলেই নয় টেলিফোনের রিসিভারটি ও তারা সঠিক ভাবে ধরতে শিখে যায়। মনে করা হয় এতদিন অবধি মা-বাবা বা শিশুদের সাথে থাকা আত্মীয় স্বজনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্যই শিশুরা প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উপযোগ সম্পর্কে এতোটা ওয়াকিবহাল হয়।
  • আচার আচরণ এবং ভাবভঙ্গি অনুকরণ করায় সক্রিয়তা – শিশুরা দুই হাত মেলে ঢেউয়ের ভঙ্গিমায় নাড়ানো বা যে কোনোরকম হাত পায়ের সক্রিয়তাভিত্তিক কাজের সহজ অনুকরণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠে। এইসময় শিশুদের মস্তিষ্কও এইসব কাজ সুষ্ঠভাবে সম্পাদনের জন্য বেশ বিকশিত হয়ে যায়।
  • শ্রুত শব্দের অনুকরণ – শিশু তার চারপাশের বিভিন্ন কর্নগোচর শব্দেরই নকল করতে চেষ্টা করে এই বয়স থেকে। তা সে মোটর গাড়ির আওয়াজই হোক বা গৃহপালিত পশুর ডাক।

দৈহিক বিকাশের মাপকাঠি –

বিকাশের এই স্তরে শিশু যা কিছু করতে সক্ষম হয় তা সবই শিশুর শারীরিক বিকাশ এবং পেশীর গঠন ও তার সক্রিয়তার জন্য।

  • কোন কিছুর সাহায্য ছাড়াই নিজে বসতে শিখে যায় একজন ১২ মাস বয়সী শিশু।
  • নিজের চেষ্টাতেই কোনো কিছুর ওপর ভর না দিয়েই দাঁড়াতেও সক্ষম হয়ে ওঠে।  মূলত পেশী এবং অস্থিসন্ধি গুলি এই সময়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে শিশুর দেহের ভার বহন করার জন্য। তাই প্রায় ১ বছর সামাণ্য চেষ্টাতেই অনায়াসে দাঁড়াতে পারে শিশুরা।
  • ই বয়সে শিশুরা শুধু যে দাঁড়াতে পারে তাই নয় আসবাব বা দেওয়াল ধরে সামনের দিকে হেঁটে যাওয়ারও চেষ্টা শুরু করে দেয়।
  • ইভাবে কোনো কিছু ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই কোনো কিছুতে ভর না দিয়ে একদিন হাত ছেড়ে একা কয়েক পা হেঁটে ফেলে।
  • বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীর সাহায্যে কোনো বস্তুকে স্পর্শ করার চেষ্টা করে এই বয়সের শিশুরা। একইসাথে হাতের তালুর সাহায্যে কোনো দ্রব্যকে সহজেই নিজের হাতের মুঠোয় ভরে ফেলতে চেষ্টা করে।
  • তর্জনীর সাহায্যে কোনো কিছুর দিকে নির্দেশ করতে পারে শিশুরা। এবং অনেকক্ষেত্রে আবার তর্জনীর সাহায্যে কোনো দ্রব্য বা জিনিসকে স্পর্শও করে শিশুরা।
  • ওপর এবং নিচের পাটি মিলিয়ে মোট ২-৩ জোড়া দাঁত গজিয়ে ওঠে ১২ মাস বয়সী শিশুদের। প্রসঙ্গত এইসব কটি দাঁতই মূলত মুখের সামনের অংশের।
  • দৃষ্টি শক্তি আগের থেকে অনেক উন্নত হয়ে ওঠে শিশুদের। হাত এবং চোখের মধ্যেকার বোঝাপড়া এই সময় অনেক বেশি সুস্থিত হয়ে ওঠে।

সামাজিক এবং মানসিক বিকাশের মাপকাঠি –

বিকাশের এই স্তরে শিশুরা সমাজের ব্যবহারিক আচার আচরণ সম্পর্কে অল্প হলেও পরিচিত হতে শুরু করে। নিজেদের মনের ভাব সহজেই আকারে ইঙ্গিতে ব্যক্ত করতেও সক্ষম হয়ে ওঠে।

  • কথা বলতে চেষ্টা করে – সামনের মানুষটি তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে অথচ শিশুটি নিজের গলার স্বর অবধি বের করছে না, এমনটা বড় একটা দেখতে পাওয়া যায়না। বরং শিশুদের সাথে কেউ কোনো কথা বললে সে তার সাধ্য মতন আকার ইঙ্গিত বা আধো অস্পষ্ট স্বরে কথা বলার চেষ্টা করে। অনেকক্ষেত্রেই শিশুদের আধো অস্পষ্ট স্বর অর্থহীন হয় তবুও তারা নিজেদের মতন করে গলার স্বর উঠিয়ে ভাব প্রকাশের চেষ্টা করে।
  • ভীতি প্রকাশ – কোনো ভয়ঙ্কর জিনিস দেখে ভয় পাওয়া, বা অন্ধকারে ভয় পাওয়া যাই হোক না কেনো শিশুরা এমন পরিস্থিতি কান্নার মাধ্যমে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে মা-বাবার দৃষ্টি আকর্ষন করে।
  • অচেনা মানুষজন দেখলে লজ্জা পাওয়া – অচেনা মানুষজন দেখলে শিশুরা সাধারণত ভয় পেয়ে যায়। অনেক সময় আবার অচেনা মানুষজন দেখলে লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে আড়ষ্ট করে রাখে।
  • মা – বাবা অথবা নিকটজনদের কাছে নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছে প্রকাশ – একজন ১২ মাস বয়সী শিশু বুঝতে পারে যে তার মা – বাবা অথবা ঘনিষ্ট জনেরা তার কোনো কাজের প্রশংসা করছে বা সেটা না করতে বলছে। বিশেষত যখন শিশু তার খেলনা ঘরের এদিকে ওদিকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় কিম্বা খাওয়ার সময় খেতে চায়না।
  • পছন্দের মানুষদের সাথে সময় অতিবাহিত করার ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। পছন্দের মানুষদের মধ্যে থাকতে পারে শিশুদের মা- বাবা বা ভাই বোন অথবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য। শিশুদের এই মনোভাব থেকে সহজেই আন্দাজ করা যায় যে তারা সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ওঠছে।

প্রত্যেকটি শিশুই তাদের নিজেদের মতন করে অন্যদের থেকে আলাদা হয়। তাই প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই বিকাশের গতি একইরকম হবে একথা মনে করার কোনো কারণ নেই। শিশুর বিকাশের গতির ব্যাপারে এখানে সাধারণ একটি ধারণা দেওয়া হলো।

১২ মাস বয়সী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টীকাকরণ –

১২ মাস বয়সের শিশুদের জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় টীকা হলো হেপ-এ ১। এছাড়াও ৯ – ১২ মাসের মধ্যে শিশুদের রাইফাইড ক্যানুগেট ভ্যাকসিন দেওয়া দরকার।

১২ মাস বয়সী শিশুর দৈনিক কতটা পরিমাণ দুধ পানের প্রয়োজন?

প্রায় ১ বছর বয়সী শিশুদের এবার চিকিৎসকের পরামর্শ মতন তরল দুধের পাশাপাশি একট আধটু সলিড ফুড বা শক্ত খাবার খাওয়ানো দরকার। স্তন পান এবং প্যাকেটজাত ফর্মুলা দুধ মিলিয়ে দৈনিক ২৪ আউন্স দুধ পানই যথেষ্ট বলে মনে করা হয় এই বয়সী শিশুদের জন্য। তবে শিশুদের খাদ্য পানীয় সংক্রান্ত যাবতীয় পরিবর্তনের পূর্বে চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে নেওয়া জরুরী।

১২ মাস বয়সী শিশুর দৈনিক কতটা পরিমান খাদ্যের প্রয়োজন?

যেহেতু এখনও তরল খাদ্য বিশেষত দুধের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা পুরো মাত্রায় যায়না। তাই খুব বেশি পরিমান সলিড খাদ্যের ওপর নির্ভরশীলতা জন্মায় না শিশুদের।

১২ মাস বয়সী শিশুদের দৈনিক কতটা সময় ঘুমের প্রয়োজন?

এই বয়সের শিশুরা রাতের বেলা আনুমানিক ১১-১২ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন। এই ঘুম একটানাও হতে পারে বা কিছু সময় অন্তরও হতে পারে। এছাড়াও প্রতিদিন দিনের বেলায় ২-৩ ঘন্টা করে দু তিন বার শিশুরা ঘুমোয়।

১২ মাস বয়সী শিশুর খেলাধূলা এবং অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়া কলাপ –

খেলাধূলা এবং অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়া কলাপ একজন শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে খুবই সহায়তা করে। নিম্নলিখিত কয়েকটি ক্রিয়া কলাপের মাধ্যমে শিশুরা দ্রুত বড় হয়ে ওঠে।

তারা ধরা খেলা –

প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি – চাঁদ, তারার আকারে পিচ বোর্ড কাটা।

খেলার পদ্ধতি – শিশুর শোওয়া বা খেলার জায়গায় মাটি থেকে অল্প উচ্চতায় ঐ পিচ বোর্ডের টুকরো গুলি ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এই পিচ বোর্ডের টুকরো গুলি এমন উচ্চতায় থাকে যেনো শিশু নিজের পায়ে দাঁড়ালে তা সহজেই ধরতে পারে।

দক্ষতার বিকাশ – এই খেলার ফলে শিশুরা সহজেই আসে পাশে থাকা আসবাব বা দেওয়ালের ওপর ভর না দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শেখে। হাতের সাহায্যে কোনো কিছু ধরে টান দিতেও শেখে।

ব্লক ট্রান্সফার গেমস –

প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি – দুটি ফাঁকা প্ল্যাস্টিকের বালতি, বিভিন্ন আকারের একাধিক টুকরো।

খেলার পদ্ধতি – একটি বালতিতে নানান আকারের টুকরো গুলিকে ভর্তি করে রাখতে হবে। এবং সেই বালতি থেকে অপর বালতিতে একটা একটা করে টুকরো হাতের সাহায্যে রাখতে হবে।

দক্ষতার বিকাশ – হাতের প্রত্যেকটা আঙুল একসাথে কাজে লাগিয়ে কোনো জিনিস ধরার ক্ষমতা গড়ে ওঠে।

শিশুর সাথে কথা বলুন – ১২ মাস বয়সী শিশুর সাথে মা – বাবা অথবা বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা এই সময় কথা বলা দরকার। এতে করে শিশুর নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার প্রবণতা জন্মাবে। নিজের মতন করে অন্যের কথার প্রেক্ষিতে ভাব প্রকাশ করতেও শিখে যাবে শিশুরা। এছাড়াও শিশুদের সাথে গান শুনুন, বিভিন্ন আকার এবং সংখ্যা সম্পর্কে কথা বলুন। একই সাথে তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গ গুলির নাম শেখানো যেতে পারে।

শিশুদের সাধারণ স্বাস্থ্য নিয়ে মা – বাবার উদ্বেগ –

এই বয়সে শিশুদের নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে তা সে দীর্ঘস্থায়ী হোক বা সাময়িক। অসুখের ধরণ যাই হোক না এই সময় শিশুর মা – বাবা সন্তানকে নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে পরে। সাধারণত শিশুর যে যে শারীরিক সমস্যা গুলি মা – বাবার উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে সেগুলি হলো যথা –

  • ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠ্য কাঠিন্য – ১২ মাস বয়স থেকেই শিশুর খাদ্য তালিকায় অল্প বিস্তর পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়। এতদিন পর্যন্ত শুধু মাত্র দুধই ছিলো শিশুর একমাত্র খাদ্য। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ মতন শিশুর খাদ্য তালিকায় সলিড ফুডের উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। যা একদিকে যেমন ডায়রিয়ার সম্ভবনা সৃষ্টি করতে পারে অন্যদিকে কোষ্ঠ্য কাঠিন্যের সম্ভবনাও সৃষ্টি করতে পারে। এইএরকম অবস্থায় চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় ওষুধ পথ্য গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
  • অ্যাজমা বা শ্বাস কষ্ট – যখন ফুসফুসের শ্বাসনালীতে প্রদাহ হয় এবং তা সংকুচিত হয়ে পড়ে যার ফলে শ্বাস গ্রহণের সময় একটা  বাঁশির শব্দ উৎপন্ন হয়। শিশুর এইরকম কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ। অনেকসময় এই অ্যাজমা অ্যাটাকের সম্ভবনা বৃদ্ধি পায় ঠাণ্ডা লাগা বা ঋতু পরিবর্তনের ফলে। তবে শিশুর যে কোনো রকম শারীরিক অস্বাভাবিকত্ব দেখা দিলে তা গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিৎ, অন্যথায় কোনো বড় বিপদের সম্ভবনা তৈরী হয়।
  • হে ফিভার – এক ধরণের জীবানু সংক্রমনের ফলে জ্বর,সর্দি, নাক থেকে অবিরাম জল পড়া, কাশি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। এইরকম উপসর্গ দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার।

শিশুর শ্রবণ শক্তি, দৃষ্টি শক্তি এবং অন্যান্য সংবেদনশীলতা –

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশুর দৃষ্টি শক্তি, শ্রবণ শক্তি, এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

শিশুরা এই সময় কী দেখতে পায়?

১২ মাস বয়সে শিশুদের দৃষ্টি শক্তি পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বয়সে তারা পছন্দের মানুষের মুখ দেখতে পছন্দ করে। এছাড়াও রঙিন ছবি, ফল ফুলের ছবি ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করে।

শিশুরা এই সময় কী শুনতে পায়?

জন্মের পর থেকেই শিশুর শ্রবন শক্তি সক্রিয় হয়ে যায়। তারপর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ধীরে ধীরে শ্রবন শক্তি প্রখর হয়ে ওঠে। এইসময় শিশুদের সাথে কথা বললে তারা তাদের সাধ্য মতন ভাব ভঙ্গিতে প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করে।

শিশুরা স্বাদ এবং গন্ধ সম্পর্কে কী সচেতন হয়ে ওঠে?

এই বয়সের শিশুদের খাবার পছন্দ বা অপছন্দ বিষয়ে একটা মতামত তৈরী হয়। তাই শিশুদের স্বাদ এবং গন্ধ বদলে খাবারের অভ্যেস করা দরকার। তবে শিশু যে খাবারের স্বাদ বা গন্ধ পছন্দ করছেনা সেটা তাকে না দেওয়াই ভালো।

কীভাবে শিশুর মা – বাবা তাদের বিকাশে সাহায্য করবেন?

  • ১২ মাস বয়সী শিশুর বড় হয়ে ওঠায় সাহায্য করার জন্য প্রত্যেক মা – বাবার কাছে অগণিত উপায় রয়েছে। এই বয়সী শিশদের সাথে সব সময় কথা বলুন, খেলা ধূলো করুন, বই পড়ে শোনান, এতে করে মা – বাবার প্রতি সন্তানের একটা টান তৈরী হবে একইসাথে সামাজিক সম্পর্কও গড়ে উঠবে। শিহসুকে ঘুম পারানোর সময় বা খাওয়ার সময় যদি গান শোনানো, বা গল্প করা উপযোগী প্রমাণিত হয় তাহলে সেটাই করা উচিৎ।
  • খেলা ধূলা বা অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়া কলাপ শিশুদের খুবই পছন্দের হয়। তাই আপনার সন্তানের সাথে বিভিন্ন রকম খেলা ধূলা করুন।
  •  শিশুদের দৃষ্টি শক্তি, শ্রবণ শক্তি, হাত – পা এবং মস্তিষ্কের মধ্যে ভারসাম্য সুদৃঢ় করার জন্য ব্লক গেমস, এবং অন্যান্য খেলা ধূলা বিশেষ ভাবে কাজে দেয়। এছাড়াও বিভিন্ন ঘরোয়া জিনিস যেমন বাটি, গ্লাস, টিকিট, রঙিন ছবিওয়ালা কার্ড ইত্যাদি শিশুদের খেলার জন্য খুবই পছন্দের হয়।
  •  শিশুদের এই বয়সে টিভি বা মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখানো থেকে বিরত রাখুন। এতে করে তাদের খেলা ধূলা সহ অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়া কলাপ সম্পর্কে আগ্রহ অনেক কমে যায়। তাই বাচ্চাদের সাথে সময় অতিবাহিত করার সময় আপনার মোবাইল ফোন দূরে রাখুন।
  • বর্তমানে চিকিৎসকেরা, মা – বাবার নিজেদের ব্যস্ততার কারণে শিশুকে অযথা টিভির পর্দার সামনে বসিয়ে রাখার তীব্র বিরোধিতা করেন।

১২ মাস বয়সী শিশুর মা – বাবার কোন সময় তাদের সন্তানদের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়া উচিৎ?

আমেরিকান অ্যাকাডেমী অফ পেডিয়াট্রিক্স (এপিপি) অনুসারে নিম্নলিখিত লক্ষন গুলি দেখা গেলে ১২ মাস বয়সী শিশুর মা – বাবার উদ্বিগ্ন হওয়া উচিৎ। (4)

  • কোনো কিছু ধরে বা ভর দিয়েও যখন এই বয়সের শিশুরা দাঁড়াতে পারেনা।
  •  যখন ঠিক মতন ভাবে বসতে পারেনা।
  •  শিশুর চোখের সামনে ঢাকা দেওয়া আছে কোনো জিনিস যখন শিশু ঢাকনা সরিয়ে দেখতে আগ্রহী না হয়।
  •  যখন শিশুদের মধ্যে বড়দের অনুকরণ করার কোনো প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়।
  •  মা – বাবা সম্বোধন করার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখা না গেলে।
  •  আঙুল দিয়ে কোনো বস্তু বা দ্রব্যের দিকে ইঙ্গিত করার প্রবণতা দেখা না দিলে।
  •  হামাগুড়ি দেওয়ার সময় পেট বা পা ঘষে চলা।

উপরিক্তো আচরণ গুলি দেখা গেলে অবিলম্বে একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা দরকার।

১২ মাস বয়সী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় কার্য প্রণালীর তালিকা বা চেকলিষ্ট –

  • নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে চিকিৎসকের কাছে শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার।
  • টীকাকরনের তালিকা – ১ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আমেরিকান অ্যাকাডেমী অফ পেড্রিয়াট্রিক্স কর্তৃক সুপারিশকৃত টীকা গুলি হলো যথাক্রমে – এমএমআর (মেসেলস, মাম্পস এবং রুবেলা) এবং চিকেনপক্স (ভ্যারিসেলা) টীকা। এছাড়াও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা এই সময় হেপাটাইটিস এ টীকা এবং/অথবা হিব এবং পিসিভি১৩ টিকার চতুর্থ ডোজের সুপারিশ করতে পারেন, কিন্তু এগুলো ১৫ মাসের চেকআপেও দেওয়া যেতে পারে।
  • শিশুর কাছে থাকার স্ময় তার সাথে অবিরাম কথা বলতে থাকুন।
  • শিশুর বয়স, তার উচ্চতা এবং আয়তনের সাথে গাড়ির সিটের সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা সেটা দেখে নেওয়া দরকার।
  • ফিডিং বোতলে খাওয়ার অভ্যেস থেকে ধীরে ধীরে গ্লাস অথবা কাপে খাওয়ানোর প্রতি শিশুদের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী –

1. ১ বছর বয়সী শিশুর দৈনিক কত ক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন?

উঃ- এই বয়সের শিশুর দৈনিক ১০০০ ক্যালোরি শক্তির প্রয়োজন হয়। যা মূলত স্তন দুগ্ধ, প্যাকেটজাত ফর্মুলা দুধ থেকেই পাওয়া যায়।

2. আমার শিশুকে কী করে কথা বলতে শেখাবো?

উঃ আপনার বাচ্চার সাথে সব সময় কথা বলুন। তার খাওয়া, স্নান করা, শোওয়া এবং অন্যান্য কার্যকলাপের সময় কথা বলুন।  প্রতিদিন তার সামনে বই পড়ুন, গান শুনুন, শিশুকে কথোপকথনে উৎসাহিত করুন। এতে করে শিশুর বিকাশের গতি দ্রুত হবে।

References: